রেটিনা কি?
রেটিনা (Retina) হলো চোখের ভেতরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর, যা আলো গ্রহণ করে এবং তা অপটিক নার্ভের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়, ফলে আমরা দেখতে পাই। এটি ক্যামেরার ফিল্মের মতো কাজ করে।
✅ রেটিনায় ফটোসেন্সিটিভ সেল (Rods & Cones) থাকে, যা আলো ও রঙ সনাক্ত করে।
✅ রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থায়ী দৃষ্টিহীনতা হতে পারে।
রেটিনার স্তর বা লেয়ার (Layers of Retina)
রেটিনা দশটি (১০) স্তর নিয়ে গঠিত:
1. রেটিনাল পিগমেন্ট এপিথেলিয়াম (RPE) – রেটিনাকে পুষ্টি যোগায়।
2. ফটোসেপ্টর লেয়ার (Photoreceptor Layer) – রড ও কন কোষ থাকে।
3. এক্সটার্নাল লিমিটিং মেমব্রেন (ELM) – রড ও কন কোষকে সাপোর্ট দেয়।
4. আউটার নিউক্লিয়ার লেয়ার (ONL) – ফটোসেপ্টরের নিউক্লিয়াস থাকে।
5. আউটার প্লেক্সিফর্ম লেয়ার (OPL) – নিউরন সংযোগ স্থাপন করে।
6. ইনার নিউক্লিয়ার লেয়ার (INL) – দ্বিপোলার ও হরিজন্টাল কোষ থাকে।
7. ইনার প্লেক্সিফর্ম লেয়ার (IPL) – নিউরন ট্রান্সমিশন হয়।
8. গ্যাংলিয়ন সেল লেয়ার (GCL) – অপটিক নার্ভের সূচনা হয়।
9. নার্ভ ফাইবার লেয়ার (NFL) – অপটিক নার্ভ গঠিত হয়।
10. ইনার লিমিটিং মেমব্রেন (ILM) – রেটিনার শেষ স্তর।
রেটিনার সাধারণ রোগসমূহ (Common Retinal Diseases)
১. রেটিনাল ডিটাচমেন্ট (Retinal Detachment):-
✅ রেটিনা তার আসল অবস্থান থেকে আলাদা হয়ে যায়।
✅ কারণ: রেটিনায় ছিদ্র, ট্র্যাকশন, অথবা তরল জমা।
২. ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি (Diabetic Retinopathy):-
✅ ডায়াবেটিসের কারণে রেটিনার রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
✅ দীর্ঘমেয়াদী ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি বেশি।
৩. হাইপারটেনসিভ রেটিনোপ্যাথি (Hypertensive Retinopathy)
✅ উচ্চ রক্তচাপের কারণে রেটিনার রক্তনালীতে ক্ষতি হয়।
✅ রক্তক্ষরণ, এডেমা ও অপটিক ডিস্ক পরিবর্তন দেখা যায়।
৪. এজ-রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (Age-related Macular Degeneration - ARMD):-
✅ বয়স বৃদ্ধির কারণে ম্যাকুলার কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
✅ দুটি ধরন: Dry ARMD এবং Wet ARMD।
৫. রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা (Retinitis Pigmentosa):-
✅ জেনেটিক রোগ, যেখানে রড কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
✅ নাইট ব্লাইন্ডনেস ও দৃষ্টির সংকোচন ঘটে।
৬. সেন্ট্রাল সিরাস রেটিনোপ্যাথি (Central Serous Retinopathy - CSR):-
✅ স্ট্রেস বা কর্টিকোস্টেরয়েড ব্যবহারের ফলে ম্যাকুলার নিচে তরল জমে।
৭. সিস্টয়েড ম্যাকুলার এডেমা (Cystoid Macular Edema - CME):-
✅ রেটিনার ম্যাকুলার অংশে তরল জমে যাওয়ার কারণে বিকৃত দৃষ্টি হয়।
রেটিনার রোগগুলোর ক্লিনিক্যাল লক্ষণ ও উপসর্গ (Clinical Features & Symptoms of Retinal Diseases)
✅ দৃষ্টির ঝাপসা হওয়া (Blurry Vision)।
✅ চোখের সামনে ভাসমান দাগ বা ফ্লোটার দেখা (Floaters)।
✅ রাতে দেখার সমস্যা (Night Blindness - RP তে)।
✅ দৃষ্টির ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া (Tunnel Vision)।
✅ রঙের বিভ্রান্তি বা ম্লানতা (Color Vision Deficiency)।
✅ চোখের সামনে আলো ঝলকানি দেখা (Flashes of Light)।
✅ দৃষ্টির একাংশ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া।
✅ ডাবল ভিশন (Diplopia)।
রেটিনার সমস্যার পরীক্ষা-নিরীক্ষা (Investigations for Retinal Diseases)
১. ফান্ডোস্কপি (Fundoscopy বা Ophthalmoscopy)
✅ রেটিনার রক্তনালী, রক্তক্ষরণ ও ক্ষত নির্ণয়ের জন্য।
২. অপটিক্যাল কোহেরেন্স টোমোগ্রাফি (OCT - Optical Coherence Tomography)
✅ রেটিনার বিভিন্ন স্তরের ক্ষতি বিশ্লেষণ করে।
৩. ফ্লুরোসিন অ্যানজিওগ্রাফি (Fluorescein Angiography - FA)
✅ রেটিনার রক্তনালীতে ক্ষত ও লিকেজ চিহ্নিত করে।
৪. বি-স্ক্যান আল্ট্রাসোনোগ্রাফি (B-Scan Ultrasonography)
✅ ভিট্রিয়াস রক্তক্ষরণ বা রেটিনাল ডিটাচমেন্ট শনাক্ত করতে।
৫. ইলেকট্রোরেটিনোগ্রাফি (ERG - Electroretinography)
✅ রেটিনার কার্যক্ষমতা পরিমাপ করে (RP-তে ব্যবহৃত হয়)।
রেটিনার রোগগুলোর চিকিৎসা (Treatment for Retinal Diseases)
১. মেডিকেল চিকিৎসা (Medical Treatment)
✅ এন্টি-ভিজিএফ ইনজেকশন (Anti-VEGF) – ARMD, DME-এর জন্য।
✅ কর্টিকোস্টেরয়েড ইনজেকশন – ম্যাকুলার এডেমার জন্য।
২. লেজার থেরাপি (Laser Therapy)
✅ প্যান-রেটিনাল ফটোকোয়াগুলেশন (PRP) – ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির জন্য।
✅ ফোকাল লেজার – ম্যাকুলার এডেমার জন্য।
৩. সার্জারি (Surgical Treatment)
✅ ভিট্রেক্টমি – ভিট্রিয়াস হেমোরেজ বা রেটিনাল ডিটাচমেন্টের জন্য।
✅ স্ক্লেরাল বাকলিং – রেটিনাল ডিটাচমেন্টের ক্ষেত্রে।
রেটিনার রোগ প্রতিরোধ (Prevention of Retinal Diseases)
✅ নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করুন (Routine Eye Check-ups)।
✅ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করুন।
✅ ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
✅ ভিটামিন A, C, E এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার খান।
✅ সানগ্লাস পরুন – অতিবেগুনি রশ্মি থেকে চোখ রক্ষা করুন।
✅ স্ট্রেস কমান – CSR প্রতিরোধের জন্য।
সংক্ষেপে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
✔ রেটিনা হলো চোখের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা আলো গ্রহণ করে দৃষ্টিশক্তি তৈরি করে।
✔ রেটিনার ১০টি স্তর রয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থায়ী অন্ধত্ব হতে পারে।
✔ রেটিনাল ডিটাচমেন্ট, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি, ARMD, গ্লুকোমা ইত্যাদি সাধারণ রোগ।
✔ নিয়মিত চোখ পরীক্ষা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন রেটিনার রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।